29th, September, 2021, 1:49 am

হুন্ডিতে কোটি টাকা যায় বিদেশে, জড়িত মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়িরাও, কারোরই নেই সরকারি অনুমোদন, গণমাধ্যমে বিপর্র্যয়ের আশঙ্কা
প্রতারণার মিশনে ডাউনলিংক-আইপিটিভি

এম হাসান : দেশজুড়ে মহা প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসেছেন এবার অবৈধ ডাউনলিংক-আইপিটিভির মালিকরা। নামমাত্র ট্রেড লাইসেন্স ও একটি কোম্পানি নিবন্ধন করেই দেশজুড়ে সম্প্রচার শুরু করেন তারা। কেউ অনলাইন মাধ্যমে আবার কেউ বিদেশি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশে সম্প্রচার করছেন নির্দ্বিধায়। দীর্ঘদিন যাবৎ বেশ কয়েকটি প্রতারক চক্র মানুষকে ভুল বুঝিয়ে টেলিভিশন সম্প্রচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন, পাশাপাশি হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে অর্থও পাচার করে আসছেন। সিএনএন বাংলা, মুভি বাংলা, চ্যানেল এসসহ রাজধানী থেকেই নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে প্রায় ১০টির বেশি টেলিভিশন চ্যানেল। নামে আইপিটিভি হলে এদের সম্প্রচার চলছে স্যাটেলাইট (ডাউনলিংক) মাধ্যমে। স্থানীয় পর্যায়ের ক্যাবল অপারেটরদের বিভিন্ন উপহার ও নগর অর্থ দিয়ে বিদেশি স্যাটেলাইট থেকে ফিট নিয়ে মডিলেটর ও রিসিভার বক্সের মাধ্যমে টেলিভিশন সম্প্রচার করছেন চক্রগুলো। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এপস্টার সেভেন, এশিয়াসেট সেট সেভেনসহ বিদেশি বেশ কয়েকটি স্যাটেলাইট কোম্পানির সাথে অবৈধ কাগজপত্র তৈরি করে চুক্তির মাধ্যমে সম্প্রচার করা হচ্ছে। এর বিনিময়ে প্রতি মাসে চ্যানেল প্রতি স্যাটেলাইট কোম্পানিকে দিতে হচ্ছে ৪-৮ লাখ টাকা।
দেশে এ সকল টেলিভিশনের বৈধতা না থাকায় হুন্ডির মাধ্যমেই তারা দেশ থেকে বিদেশে অর্থপাচার করে স্যাটেলাইট ভাড়া দিয়ে যাচ্ছেন। সরকারের তরফ থেকে অবৈধ স্যাটেলাইট টেলিভিশন সম্প্রচারে ক্যাবল অপারেটরদের নির্দেশনা দেয়া থাকলেও অবৈধ প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা নিয়েই এসকল টেলিভিশন চালাচ্ছেন তারা। এদিকে অবৈধ টেলিভিশন মালিকরা আধিপত্যবিস্তার, মাদক অস্ত্র ব্যবসা ও তাদের ভণ্ডামির বাহারি বিজ্ঞাপন প্রচার করছেন বলেও তথ্য রয়েছে। প্রতিদিন রাত ১১টার পর থেকে সকাল পর্যন্ত এসকল টেলিভিশনে আধ্যাত্মিক ফকির, নিষিদ্ধ হারবাল, তাবিজ কবজের বিজ্ঞাপন সম্প্রচার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন টেলিভিশন মালিকরা। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বেশ কিছু ক্যাবল অপারেটররাও। এছাড়াও সারাদিন এসকল টেলিভিশনে দেশি বিদেশি ছায়াছবি সম্প্রচার করে দর্শকদের আকৃষ্ট করা হয়ে থাকে । তবে ছায়াছবির প্রকৃত মালিকরাও জানেন না তাদের ছায়াছবিগুলো এসকল অবৈধ টেলিভিশনে প্রচারিত হচ্ছে। অনেক টেলিভিশন আবার দেশ বিদেশের সংবাদও প্রচার করছে নির্দ্বিধায়। উপজেলা থেকে শুরু করে জেলা বিভাগ ও থানা পর্যায়ে টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দিচ্ছেন সংবাদকর্মী। অনেক নব্য গণমাধ্যমকর্মীই এসকল প্রতারকদের ভেলকিবাজির মধ্যে পরে প্রতাড়িত হচ্ছেন। তাদেরকে বৈধ স্যাটেলাইট টেলিভশন এবং পরিক্ষামূলক সম্প্রচারের কথা বলে টাকা নিয়ে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।
আবার এসকল টেলিভিশনের পরিচয়পত্র নিয়ে অনেক অপরাধীই গণমাধ্যমকর্মী পরিচয়ে মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধ করে বেড়াচ্ছেন। কেউ কেউ আবার টেলিভিশনের নামে ইউটিউব ও ফেসবুক ব্যবহার করেও নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন টেলিভিশনের সাংবাদিক মালিক হিসেবে। একইভাবে দেশে সম্প্রচার হচ্ছে অনলাইনভিত্তিক আইপিটিভি। অনলাইন প্রটোকল অনুযায়ী সম্প্রচার টেলিভিশনগুলোকেই আইপিটিভি হিসেবে বলা হয়ে থাকে। এসকল টেলিভিশন মোবাইলের ইনটারনেটেও দেয়া যায়। জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্নস্বীকৃত ঘাতক ফারুক রহমানের ফ্রিডম পার্টি করতেন আতাউল্লাহ খান। তিনি ‘জনতার টিভি’ নামে একটি ইন্টারনেট প্রটোকল টেলিভিশন (আইপি টিভি) খুলেছেন। আতাউল্লাহ খানের বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফে। তার ভাই শফিকউল্লাহ খান ১৯৯৬ সালে মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনে ফ্রিডম পার্টির সংসদ সদস্য প্রার্থী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর ডালিমের সঙ্গে তাদের পরিবারের সখ্য ছিল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশিরভাগ আইপি টিভির মালিকদের বড় অংশই রয়েছেন বিতর্কিত রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। বিভিন্ন সময় এসকল অবৈধ টেলিভিশনে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে।
এদের তদারকিতেও নেই কেউই। নূর মোস্তফা টিনু চালাচ্ছেন সিটিজি ক্রাইম টিভি নামের একটি আইপিটিভি। টিনুর বড় ভাই মোহাম্মদ সেলিম জামায়াতে ইসলামীর রুকন পর্যায়ের একজন নেতা। টিনুর ছোট ভাই নূর মুহাম্মদ শিপু চট্টগ্রামের চকবাজার থানা ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন বলে জানা গেছে। ২০০৩ সালে চট্টগ্রামের গোল পাহাড় মোড় থেকে অত্যাধুনিক চায়নিজ একে-২২ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন টিনু। ২০১২ সালে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালে টিনুকে বিদেশি পিস্তল, শটগান ও ৬৭ রাউন্ড গুলিসহ আটক করে র‌্যাব । খুনের মামলার আসামি হাসানের নিয়ন্ত্রণে চলছে চট্টলা ২৪ টিভি। ১৯৯৯ সালের ১১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের সদরঘাটের ডিলাইট রেস্তোরাঁ থেকে কাটা রাইফেল ও গুলিসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন হাসান।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা ও চট্টগ্রামের নাজিরহাট কলেজের অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করায় ২০০১ সালের ১৬ নভেম্বর কুপিয়ে নৃশংসভাবে খুন করে শিবির ক্যাডাররা। গোপাল কৃষ্ণ হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে ২০০২ সালের ২০ আগস্ট নগর গোয়েন্দা পুলিশ হাটহাজারী উত্তর মাদ্রাসা থেকে গ্রেপ্তার করে হাছানকে। তবে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে তিনি ওই মামলায় ছাড়া পান। এছাড়াও কুমিল্লা টিভি, দোয়েল টিভি, মা টিভি, মুক্তি টিভি, জবস টিভি, নান টিভি, নতুন সময় টিভি, টি ওয়ান টিভি, কাজি টিভি, কে টিভি, ৭১ বাংলা টিভি, কিউ টিভি বাংলা, আলিফ টিভি, আইবিএন টিভি, জি বাংলা টিভি, নিউজ ১০, স্বপ্ন টিভি, রূপসী বাংলা টিভি, টাইমস ২৪ টিভি, ফূর্তি টিভি, স্টার বাংলা টিভি, বঙ্গ টিভি, বিবিসি বাংলা টিভি, জাগো টিভি, ম্যাজিক বাংলা টিভি, রয়েল বাংলা টিভি, আরএন টিভি, মাতৃজগত টিভি, ফ্যামিলি টিভি, দাওয়া টিভি, চ্যানেল ৬ টিভিসহ বিভিন্ন নামীয় টিভি রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এসকল আইপি টিভির অনেকেই জড়িত চাঁদাবাজিতে। খুনের মামলাও ঝুলছে কারো বিরুদ্ধে, রয়েছে অস্ত্রসহ একাধিবার গ্রেপ্তারকৃতরাও। এভাবেই অনুমোদনহীন ডাউনলিংক-আইপি টিভি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। মূলধারার টেলিভিশনগুলো এসকল ভুঁইফোড় আইপি টিভির কারণে কোণঠাঁসা হয়ে পড়েছে অনেক ক্ষেত্রে। দেশে কথিত এসকল টিভির বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা নিতে না পারলে সমাজে গণমাধ্যম সম্পর্কে ভুল বার্তা যাবে, এমনটিই মনে করছেন টেলিভিশনের নীতিনির্ধারকরা। দেশে নামে বেনামে কত আইপি টিভি চলছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই কারো কাছেই। তবে একটি আইপি টিভিরও সরকারি অনুমোদন নেই। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (টিভি-২) রুজিনা সুলতানা জানিয়েছেন, দেশে কোনো ডাউনলিংক বা আইপি টিভির অনুমোদন তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়নি। অনেকে আইপিটিভির নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছেন।
Please share this news ..
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Comments are closed.

     More News Of This Category

follow us on facebook page