28th, May, 2022, 9:39 am

ভারি হচ্ছে রেলওয়ের লোকসানের পাল্লা

নিজস্ব প্রতিনিধি : বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকসানের পাল্লা ক্রমাগত ভারি হচ্ছে। সরকার ওই খাতে বিপুল বিনিয়োগ করা সত্ত্বেও লোকসান কমানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশ রেলওয়ে গত অর্থবছরে (২০২০-২১) আয় করেছে ১ হাজার ১৩ কোটি টাকা। আর ওই সময়ে ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ২৫ কোটি টাকা। বিগত ২০১৯-২০ অর্থবছরেও ১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা আয় করতে রেল ব্যয় করে ৫ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। তার আগের অর্থবছরে ১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় হয় ৬ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। গত ৩ বছরে রেলের ৩ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা আয় হলেও ব্যয় হয়েছে ১৮ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। ওই সময়ে রেলকে ১৫ হাজার ১৪১ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। তার বাইরে রেলের বিভিন্ন প্রকল্প ব্যয় তো রয়েছেই। রেলে ৩৯ উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা।

ওই প্রকল্পগুলো সমাপ্ত হলে রেলের ব্যয়ের অঙ্ক তিনগুণের বেশি বাড়বে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। বর্তমানে শুধু দেশের রেলপথই নয়, রেলওয়ে ব্রিজ, ইঞ্জিন-কোচসহ সিগন্যাল ব্যবস্থাও নড়েবড়ে অবস্থায় রয়েছে। ওসবের অধিকাংশরই আয়ুষ্কাল শেষ। কিন্তু কর্তৃপক্ষ ওসবে গুরুত্ব না দিয়ে নতুন নতুন প্রকল্পে গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে ব্যয় বাড়ছে কিন্তু সমাপ্ত প্রকল্পের কোনো সুফল মিলছে না। তাতে রেলের খরচ বাড়লেও আয় বাড়ছে না। অথচ বেসরকারি পর্যায়ে ট্রেন দেয়া হলে রেলের আয় বাড়তো। অর্থাৎ সরকারের চলমান ট্রেনের সঙ্গে আরো বহু ট্রেন চালানো সম্ভব হতো। বর্তমানে রেলে প্রায় ২৫ হাজার লোকবল স্বল্পতা রয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে ট্রেন চালানো হলে-লোকবলও বেসরকারি পর্যায়ে নিয়োগ হতো। তাতে সেবা বৃদ্ধির পাশাপাশি আয়ও বাড়তো।

সরকার রেলের উন্নয়নে আমূল পরিবর্তন আনতে বরাদ্দ বাড়ানোর সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পও বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু তারপরও রেলপথ ঝুঁকি থেকে বের হতে পারছে না। বর্তমানে রেলওয়েতে প্রায় দেড় লাখ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। তাছাড়া ৩০ বছরের মাস্টারপ্ল্যানে (২০১৫-২০৪৫) সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। রেলে কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের সঙ্গে নামেমাত্র ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহে প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। কোচ-ইঞ্জিন ক্রয়ে প্রাধান্য না দিয়ে নতুন রেলপথ, ভবন নির্মাণে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। অথচ চাহিদার আলোকে কোচ-ইঞ্জিন ক্রয় এবং চলমান রেলপথের সংস্কার করে বিদ্যমান রেলপথেই প্রায় দ্বিগুণ ট্রেন চালানো সম্ভব। আর এখনো রেলের প্রায় ৬ হাজার একর জমি বেদখলে রয়েছে। ওই জমি উদ্ধার করে তা কাজে লাগিয়ে এবং কোচ সংযুক্ত করে রেলের আয় দ্বিগুণ করা অনায়াসেই সম্ভব। বর্তমানে রেলে লাগাতার লোকসানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনা।

করোনায় ট্রেন চলাচল বন্ধসহ অর্ধেক যাত্রী নিয়ে ট্রেন চলায় প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি টাকা আয় কম হচ্ছে। মূলত কোনো ট্রেনই খালি সিট নিয়ে চলাচল করে না। ট্রেনগুলোতে চোখ রাখলেই উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়ে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় জোগান কম। তাছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় ট্রেন চালানো ও বিরতি দেয়ারও অনেক অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কম গুরুত্বের পথেও আসন সংখ্যা খালি রেখেই একাধিক ট্রেন চালানো হচ্ছে। কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ পথেও ট্রেন বাড়ানো হচ্ছে না। এদিকে রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে শুধুমাত্র লাইন সংস্কার নিশ্চিত করে আরো প্রায় ১০০টি ট্রেন চালানো সম্ভব। ওই দুই অঞ্চলে এখনো গড়ে ২ ঘণ্টা পরপর ট্রেন চলাচল করছে। বর্তমানে অধিকাংশ রেলপথেই যথাযথ পাথর স্বল্পতা রয়েছে। লাইনও পরিবর্তন করা প্রয়োজন। লাইন শক্তিশালী হলে অল্প সময় পরপর ট্রেন চালানো সম্ভব। অন্যদিকে গণপরিবহণ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের অন্যান্য দেশ রেল সেবার সঙ্গে আয়ও করছে।

কিন্তু বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকসানের পাল্লা দিন দিন ভারী হচ্ছে। তার অন্যতম কারণ সক্ষমতার দিকে না তাকিয়ে শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের দিকে ধাবিত হওয়া। কর্তৃপক্ষ চলমান রেলপথকে সংস্কার না করে বাহারি প্রকল্পের দিকে ধুঁকছে। অথচ সেবা নিশ্চিত করে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো যায়। সংস্কারহীন রেলপথে শুধু ট্রেন চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে না, মানুষের প্রাণও কাড়ছে। অথচ দক্ষতা বাড়িয়ে যাত্রীচাপ কাজে লাগিয়ে অনায়াসেই রেলওয়ের লোকসান কমিয়ে আনা সম্ভব। অপরিকল্পিত এবং সুদূর প্রসারবিহীন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা, চলমান রেলপথ ও অবকাঠামোর যথাযথ ব্যবহার না করার কারণেই লোকসানের অঙ্ক বাড়ছে। চলমান নড়বড়ে রেলপথ, রেল ব্রিজ, ইঞ্জিন-কোচ ও সিগন্যাল ব্যবস্থা সক্রিয় করা গেলে রেলের গতি অনেক বাড়ানো সম্ভব। তাতে লোকসানও অনেকাংশে কমে আসবে। বর্তমানে ২৫৯টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে।

আর মালবাহী ট্রেন চলছে ৩৮টি। প্রতিটি যাত্রীবাহী ট্রেন ন্যূনতম ১৬-২০টি কোচ নিয়ে চলার কথা। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ১০৪টি আন্তঃনগর ট্রেন গড়ে ৭-১৪টি বগি নিয়ে চলছে। শুধু চলমান আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতেই আরো প্রায় ৭৩০টি কোচ সংযুক্ত করা সম্ভব। তাতে প্রতিদিন প্রায় ৭৩ হাজার যাত্রী বেশি পরিবহণ করা সম্ভব। ফলে আন্তঃনগর ট্রেন থেকে দিনে ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত আয় হতো। বাকি ২৫৫টি মেইল, কমিউটার এবং লোকাল ট্রেন ৩-৭টি কোচ নিয়ে চলাচল করছে। ওসব ট্রেনে গড়ে ৬টি করে কোচ সংযুক্ত করলে ১ হাজার ৫৩৯টি অতিরিক্ত কোচ সংযুক্ত করা যায়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার সাহাদাত আলী জানান, রেল সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বে রেল পরিচালনায় লাভজনক হলো কি হলো না সেটা বাংলাদেশের জন্য মুখ্য নয়। তবে ট্রেন, কোচ বাড়িয়ে আয় বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশ্বে লাভজনক রেল ব্যবস্থাপনায় যাত্রীবাহী ট্রেনের চেয়ে মালবাহী ট্রেন বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

দেশের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সমাপ্ত হলে এবং মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ট্রেনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণের চেয়েও বেশি হবে। সার্বিক বিষয়ে রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন জানান, সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে লোকসান বলে কিছু নেই। সরকার রেলকে বিশ্ব উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই সেবার সঙ্গে আয়ও বাড়বে। বর্তমান সরকার যে ধারায় উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছেপ্রকল্পগুলো সমাপ্ত হলে রেলের আমূল পরিবর্তন আসবে। যাত্রীসেবা বৃদ্ধি এবং সমগ্র জেলায় রেলওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

Comments are closed.

     More News Of This Category

follow us on facebook page