20th, August, 2022, 3:07 am

জোনভিত্তিক লকডাউন শুরু

নিজেস্ব প্রতিনিধি : কোভিড-১৯ সংক্রমণের শততম দিনে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানোর শেষ অস্ত্র হিসেবে সারাদেশে জোনভিত্তিক লকডাউন কার্যকর করতে যাচ্ছে সরকার। গতকাল রবিবার জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জানান, আজ সোমবার থেকে সারাদেশে জোনভিত্তিক লকডাউন কার্যকর করা হবে। রেড জোন এলাকায় থাকবে সাধারণ ছুটি। আর অন্যান্য জোনে সীমিত আকারে সবকিছু খোলার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। যেখানে অসুস্থ, বয়স্কজন ও প্রসূতি কর্মীদের জন্য বাড়িতে অবস্থানের সুযোগসহ রাখা হয় বেশ কিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে অফিস করার নির্দেশনা। ৮ মার্চ প্রথম হানা দেয়ার পর প্রাণঘাতি এই ভাইরাস দেশের ৬৪ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে ৭ মে। এরপর থেকেই ক্রমেই সংক্রমণের বিস্তার বেড়ে চলছে। করোনা পরিস্থিতিতে টানা দুই মাসেরও বেশি সময় (২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে) বন্ধ থাকার পর সীমিত পরিসরে অফিস খুলে গত ৩১ মে। এরপর সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় সংক্রমণের বিস্তার অনুযায়ী এলাকা ভাগ করে জোনভিত্তিক লকডডাউন কার্যকরের। এরই অংশ হিসেবে পাইলট আকারে রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারসহ দেশের কয়েকটি এলাকায় দেয়া হয় জোনভিত্তিক লকডাউন। ওই সময় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পর্যায়ক্রমে তা পুরো দেশেই কার্যকরা করা হবে। কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে তৈরি করা কৌশলপত্রে ঢাকার কোনো এলাকায় শেষ ১৪ দিনে প্রতি লাখে ৬০ জন বা তার বেশি লোক সংক্রমণের শিকার হলে তাকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত হবে। রেড জোনকে বিপজ্জনক এলাকা বিবেচনা করা হয়। তিন থেকে ৫৯ জন নিশ্চিত করোনা রোগী থাকলে সেটি হবে ইয়েলো জোন। ঢাকার বাইরে এই সংখ্যা হবে তিন থেকে নয়জন। আর তিনজনের কম অথবা কোনো রোগী না থাকলে সেটি হবে গ্রিন জোন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণের ভিত্তিতে জোন ভাগ করে লকডাউন দেয়া বিজ্ঞানভিত্তিক একটি পদ্ধতি। এখনো যেহেতু করোনা ভাইরাসকে ঠেকাতে কোনো ধরনের ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি; তাই লকডাউন কার্যকরের মাধ্যমেই এর বিস্তার ঠেকানো সম্ভব। বিশে^র অনেক দেশই এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে সুফল পেয়েছে। ঢাকার টোলারবাগ এলাকা এবং মাদারিপুরের শিবচরকেও লকডাউন করে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। তাই জোনভিত্তিক যে লকডাউন তা করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের শেষ অস্ত্র। এই কার্যক্রমের সফলতার ওপর নির্ভর করছে দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যৎ।

সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশকে কঠোর পরীক্ষা দিতে হবে বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, সামনে আমাদের চ‚ড়ান্ত পরীক্ষার সময়। একটু ভুল আমাদের নিয়ে যাবে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে। তাই এখন আমাদের আঁটঘাট বেঁধেই মাঠে নামতে হবে। কোনো প্রকার ঢিলেমি দিলে চলবে না। জোনভিত্তিক লকডাউনের সুফল আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। তবে এর জন্য জনগণকেও সচেতন হতে হবে। তাদের সচেতনতার ওপর লকডাউনের সুফল নির্ভর করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, করোনা ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে দুটি বিষয় আছে একটি প্রতিরোধমূলক এবং অন্যটি শুশ্রুষামূলক। সংক্রমণ কমাতে এখন আমাদের প্রতিরোধেই মনোযোগ দিতে হবে। আর এর জন্য রেড-ইয়েলো-গ্রিন জোনে এলাকাভিত্তিক লকডাউনের যে কার্যক্রম সরকার ঘোষণা করেছে, তাতে আমাদের বেশি মনোযোগ দিতে হবে। রেড-ইয়েলো-গ্রিন কার্যক্রমকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে এই জনস্বাস্থ্যবিদ বলেন, এই কার্যক্রমের জন্য দরকার জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের। জাতীয় পর্যায়ে তাদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে ৫০০ থেকে এক হাজার জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নিয়ে টিম করা যেতে পারে। তাদের একেকজনকে এক একটি হটস্পট এলাকার দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। তারা ওই এলাকায় যারা করোনায় আক্রান্ত তাদের শনাক্ত করে যেমন আইসোলেশন নিশ্চিত করবেন। তেমনি আক্রান্তদের সংস্পর্শে যারা এসেছেন তাদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করবেন। এই দুই কাজের পাশাপাশি আরেকটি কাজ তারা করবেন আর সেটি হলো ওই এলাকা থেকে কেউ যাতে বাইরে যেতে না পারে, সংক্রমণ যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেই বিষয়টিও কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এভাবে এক, দেড় কিংবা দুই মাসের মধ্যে ওই এলাকায় নতুন সংক্রমণ রোধের ক্ষেত্রে তারা ভূমিকা রাখতে পারেন। এর পাশাপাশি শুশ্রুষামূলক কার্যক্রমের জন্য অক্সিজেন এবং অনান্য যে সুরক্ষাসামগ্রী আছে সেগুলো দিয়ে হাসপাতালকে সমৃদ্ধ করলে যারা আক্রান্ত হবে তাদের সেবা দেয়া এবং মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মন দেন অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বৈজ্ঞানিক ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, এরকম মহামারিতে আমাদের প্রধান কাজ হচ্ছে, সংক্রমণের বিস্তারটা ঠেকানো। সেই লক্ষ্যেই জোনভিত্তিক কার্যক্রম নেয়া হয়েছে। ঢাকার টোলারবাগ এলাকা এবং মাদারীপুরের শিবচরকেও লকডাউন করে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। তবে এর জন্য মানুষের মধ্যে সচেতনতাও দরকার। কিন্তু আমরা দেখছি মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদাসীনতা কাজ করে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. চিন্ময় দাস ভোরের কাগজকে বলেন, করোনার সংক্রমণ নিজে নিজে কিংবা শুধু জোন ভাগ করে বাঁশ দিয়ে রাস্তা আটকে রাখলেই ঠেকানো যাবে না। স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে এখনো মানুষের মধ্যে অনাগ্রহ। অনেকে মাস্ক ব্যবহার করলেও তা অধিকাংশ সময়ই থাকে মাথার উপর, নাকের কিংবা থুতনির নিচে। সামাজিক যে দূরত্বের কথা বলা হয় তাও মানে না। মানুষের এমন আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। এক কথায় সম্ভাব্য সব ধরনের উদ্যোগ নিয়ে এই জোনভিত্তিক কার্যক্রম সফলে আমাদের দ্রুত মাঠে নামতে হবে। কেননা, সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে এটিই আমাদের শেষ অস্ত্র।

Comments are closed.

     More News Of This Category

follow us on facebook page